দিরাইয়ে দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মনোনয়ন পত্র বাছাইয়ে উৎকোচ আদায়ের বিস্তর অভিযোগ

 

দিরাই প্রতিনিধি ঃ- সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ৯ টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আগামী ২৬ ডিসেম্বর। চার ভাগে বিভক্ত করে চারজন রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে নির্বাচন পরিচালনার জন্য। গেল ২৫ নভেম্বর ছিল মনোনয়ন পত্র জমা দানের শেষ দিন। রোববার হয়েছে মনোনয়ন পত্র বাছাই। মনোনয়ন পত্র বাছাই কালে দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রার্থীদের নিকট থেকে অভিনব কায়দায় মোটা অংকের নগদ টাকা হাতিয়ে নেয়ার বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। দিরাইয়ের রফিনগর- ভাটিপাড়া ইউনিয়নের রিটার্নি কর্মকর্তা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দেলোয়ার হোসেন ও তাড়ল – কুলঞ্জ ইউনিয়নের রিটার্নিং কর্মকর্তা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য অফিসার শরিফুল আলমের বিরুদ্ধে খোড়া অযুহাতে মনোনয়ন পত্র বাতিল করার ভয় দেখিয়ে উৎকোচ আদায়ের এসব অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী প্রার্থীরা।

সরেজমিনে ও ভুক্তভোগী অভিযোগ কারীদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, চার জন রিটার্নিং কর্মকর্তার মধ্যে দুই কর্মকর্তা উপজেলা পরিষদের সন্মেলন কক্ষে জন সম্মুখে প্রার্থী দের মনোনয়ন পত্র বাছাই কাজ করলেও অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা কঠোর গোপনীয়তার সহিত দরজা বন্ধ করে একেকজন প্রার্থীকে ডেকে নিয়ে মনোনয়ন পত্র বাছাই কাজ করেন। অভিযোগকারীরা বলেন এ যেন কোন ডাক্তারের চেম্বার একজন করে ডেকে নিয়ে মনোনয়ন ফরম দেখে বিভিন্ন ধরনের ভুল দেখিয়ে পরে চাহিদামতো অর্থ রেখে ছেড়ে দেয়।
সরেজমিনে দেখা যায় দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার কক্ষের সামনে প্রার্থীদের বিরাট জটলা। উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার অফিসের দরজায় দাড়িয়ে আছে রাজানগর কে সি উচ্চ বিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরী সমির রায়।ভিতরে বাছাই করছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন। নির্বাচনে কোন দায়িত্বে না থাকলে সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা জহির রায়হান তাকে সহযোগিতার জন্যে বসে আছেন। একজনের বাছাই শেষে
আরেকজনকে ডেকে নিচ্ছে দরজায় দাড়িয়ে থাকা সমির রায়।মাঝে মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা মাইকে প্রার্থী ডেকে নিচ্ছেন। অভিযোগ কারীরা বলেন এভাবেই গোপন কক্ষে মনোনয়ন পত্র বাছাইকরে প্রার্থীদের নিকট থেকে নগদ টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে । একই চিত্র কুলঞ্জ ও তাড়ল ইউনিয়ন রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে। মৎস্য অফিসের সহকারীদের কক্ষে শ্রীবাস দাসের কাছে প্রার্থীরা হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে হয়। দুই ইউনিয়নের ভুক্তভোগীরা জানান, শ্রীবাস দাস মনোনয়ন পত্র জমা দেয়ার পরদিন থেকে মোবাইলে কল দিয়ে বিভিন্ন প্রার্থীকে জানিয়েছে ফরমে ভুল আছে বাছাইয়ের দিন টাকা নিয়ে আসবেন, স্যারকে খুশি করতে হবে না হলে মনোনয়ন পত্র বাতিল হবে। সরেজমিনে দেখা যায় শ্রীবাস প্রার্থীদের দর কষাকষি করে রফা শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা শরিফুল আলমের দরজা বন্ধ কক্ষে দরজায় দাড়িয়ে একই অফিসে কর্মরত রাসেল মিয়া একেকজনকে ভিতর ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি প্রার্থীর প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীকে ও ভিতরে যেতে দেয়া হয়নি। এভাবেই দিনভর দুই রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রার্থী বাছাই কাজ করেন। তাড়ল ইউনিয়নের সদস্য পদপ্রার্থী শহিদুল ইসলাম, বাবুল দাস, হোসাইন মিয়াসহ অনেক পুরুষ মহিলা এ প্রতিবেদক বলেন, তাদেরকে মৎস্য অফিসের শ্রীবাস দাস আগেই মোবাইলে কল দিয়ে জানিয়েছে মনোনয়ন পত্রে ভুল আছে টাকা নিয়ে আসবেন স্যারকে খুশি করতে হবে নাহলে ফরম বাতিল হবে। শহিদুল ইসলাম ও বাবুল দাসের সাথে শ্রীবাসের টেবিলে গেলে এর সত্যতা পাওয়া গেলে গোপনে তাদের দর কষাকষির বিষয়টি মোবাইলে অডিও রেকর্ড করা হয়। তাড়ল ইউনিয়নের সদস্য পদপ্রার্থী হোসাইন মিয়া জানান শ্রীবাস দাস তার কাছে পাঁচ হাজার টাকা দাবী করে।অনেক অনুনয়ের পর আরেকজনের অনুরোধে ১২০০ টাকা দিয়ে সমাধান করেছি। রফিনগর ইউনিয়নের কয়েকজন চেয়ারম্যান ও সদস্য পদপ্রার্থী একই অভিযোগ দিয়ে বলেন প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরমে ভূল আছে, স্বাক্ষর আছে নাম নেই,নাম আছে স্বাক্ষর নেই, তা ঠিক করে দেয়া হবে, টাকা না দিলে মনোনয়ন বাতিল করা হবে। এসব বলে রিটার্নিং কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন ও সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা জহির রায়হান গোপন কক্ষে একজন একজন করে ডেকে নিয়ে ১ হাজার করে টাকা নিয়ে মনোনয়ন পত্র বাছাই করেছে। রফিনগরের সদস্য পদপ্রার্থী নারায়ন চক্রবর্তী ও ফটিক সরকার বলেন কয়েকবার নির্বাচন করেছি কিন্ত বাছাইয়ের দিন রিটার্নিং কর্মকর্তা এভাবে টাকা নিতে কোন দিন দেখি নাই।
ভাটিপাড়া ইউনিয়ন সদস্য পদপ্রার্থী মিন্টু চৌধুরী বলেন, নির্বাচন অফিসের লোক দিয়ে মনোনয়ন ফরম লিখে জমা দিয়েছি, আমার ফরমে কোন ভুল নেই তারপর টাকা দিতে হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে মোবাইল কলে জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন আমি কোন টাকা নেইনি বলে লাইন কেটে দেন। অপর রিটার্নিং কর্মকর্তা শরিফুল আলমের দুটি মোবাইল নাম্বারে কল দিলে দিনভর বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। সুনামগঞ্জ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুরাদ উদদীন হাওলাদার বলেন মনোনয়ন পত্র বাছাই কোন গোপন কক্ষে করা যাবেনা, প্রকাশ্য সকল প্রার্থীদের উপস্থিতিতে জন সম্মুখে করতে হবে। টাকা নেয়ার অভিযোগর বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। উল্লেখ্য দুই রিটার্নিং কর্মকর্তা অধীনের চার ইউনিয়নে একজন মাত্র সদস্য পদপ্রার্থী ভোটার তালিকায় সমস্যা থাকায় প্রার্থীতা বাতিল হয়। বাকি সকলেরই বৈধ ঘোষণা করা হয়।